সবার জানা দরকারঃ ইরানের জেনারেল কাশেম সোলাইমানির হত্যাকাণ্ডের পূর্বাপর।(পর্ব দুই)
ইরানের ‘দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নেতা’ জেনারেল কাসেম সোলাইমানিকে হত্যার পর প্রথমে বেশ উচ্ছ্বসিতই হয়েছিলেল আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যদিও তাঁর এই উচ্ছাস জরুরি ভিত্তিতে প্রাপ্ত হত্যা পরবর্তী গোয়েন্দা রিপোর্টের ভিত্তিতে অল্প কয়েক ঘন্টার মধ্যেই কেটে যায়। একেবারেই আতংকিত হয়ে দিয়ে বসেন, মৈত্রী প্রস্তাব, "পাল্টা হামলা না হলে, ইরানের বিরুদ্ধে অবরোধ প্রত্যাহারের কথা বিবেচনা করা হবে।"
ইরানের সামরিক শক্তি, খোদ আমেরিকান নীতি নির্ধারকদের কেউ কেউ এটাকে খুবই ভুল সিদ্ধান্ত বলে মনে করা ও বিশ্বব্যাপী এর প্রতিক্রিয়ার ফলে এমন বক্তব্য দিতে বাধ্য হল মিস্টার ট্রাম্প।
ইরানের কুদস ফোর্সের কমান্ডার কাসেম সোলাইমানিকে হত্যায় যেমন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিকরা বিভক্ত হয়ে পড়েছেন, তেমনি বিশ্বের বড় বড় শক্তিগুলোতে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। সোলাইমানিকে হত্যার নিন্দা জানিয়েছে রাশিয়া, ফ্রান্স, জার্মানি, কানাডা, সিরিয়া, চীন, মালয়েশিয়া, কাতার, তুরস্ক, ইন্দোনেশিয়া ও ইউরোপিয়ান কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট চার্লস মিশেল। হত্যার সাথে পরোক্ষ ভাবে জড়িত বলে সন্দেহ করা ইরানের শত্রু সৌদি আরবের বর্তমান সরকারের তরফেও আনুষ্ঠানিক ভাবে নিন্দা জানানো হয়েছে।
রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, "এই হত্যাকা- মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে উত্তেজনাকে বৃদ্ধি করবে।" জেনারেল কাসেম সোলাইমানি হত্যাকে একটি ‘অ্যাডভেঞ্চারিস্ট’ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে রাশিয়া। রাশিয়ার পার্লামেন্টের উচ্চ কক্ষের পররাষ্ট্র বিষয়ক কমিটির প্রধান যুক্তরাষ্ট্রের ওই বিমান হামলাকে একটি ভুল পদক্ষেপ হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেছেন, "এটা হামলাকারীদের বিরুদ্ধেই বুমেরাং হতে পারে।" শুক্রবার হত্যাকাণ্ডের সংবাদ নিশ্চিত হওয়ার পরই কোনস্টান্টিন কোসাচেভ তার ফেসবুকে লিখেছে, "ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে সমাধানের শেষ আশাটুকুও ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। এখন ইরান তার পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পদক্ষেপ দ্রুততর করতে পারে, যদিও এর আগে তাদের এমন পরিকল্পনা ছিল না।হতে পারে পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টারা পুরোপুরি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে অবহিত করেননি সংশ্লিষ্ট বিষয়ে। এ বিষয়ে মার্কিনিরা কোনো স্ট্রাটেজিক অবস্থান নেয় নি।"
উভয় পক্ষকে শান্ত ও বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছে ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র চীন। তারা এ ঘটনায় উচ্চ মাত্রায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জেং শুয়াং ৩রা জানুয়ারি হত্যাকাণ্ডের সংবাদ প্রচারের পর আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে এমন কথাই বলেন। এতে তিনি আরো বলেন, "আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে শক্তির ব্যবহারের সব সময় বিরোধিতা করে চীন।" উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি পাওয়ার বিরুদ্ধে তারা সতর্ক করেছে। ইরানকে একঘরে করে দেয়া এবং তার অর্থনীতিকে ধসিয়ে দিতে যুক্তরাষ্ট্রের যে প্রচেষ্টা তার বিরোধিতা করে আসছে সেব দেশ, তার মধ্যে অন্যতম চীন। গত মাসে ভারত মহাসাগরে প্রথমবারের মতো ইরান ও রাশিয়ার নৌবাহিনীর সঙ্গে মহড়ায় যোগ দিয়েছে চীন।
হত্যাকান্ডকে ঘিরে উত্তেজনা বৃদ্ধিতে উদ্বেগ জানিয়েছে ফ্রান্স। দেশটির পররাষ্ট্র বিষয়ক উপমন্ত্রী আমেলি ডি মন্টচালিন বলেছেন, আমরা ঘুম থেকে উঠেই জানতে পারি হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে বিপজ্জনক পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হয়েছে। সামরিক উত্তেজনা সব সময়ই বিপজ্জনক। এই উত্তেজনা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর পরে প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রন। তিনি নতুন বিপজ্জনক উত্তেজনা এড়ানোর পক্ষে এবং সবাইকে বিরত থাকার অনুরোধ করেন।
বৃটিশ সরকার সতর্কতার সঙ্গে বলেছেন, আরো যুদ্ধ আমাদের কারো পক্ষে যাবে না। বৃটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোমিনিক রাব বলেছেন, কাসেম সোলাইমানি নেতৃত্বাধীন ইরানের কুদস বাহিনী যে আগ্রাসী হুমকি হয়ে আছে, সে বিষয়টি সব সময়ই স্বীকার করে বৃটেন। তবে এই বিবৃতিতে ওই হত্যাকান্ডের পক্ষে বা বিপক্ষে সুনির্দিষ্ট কোনো মন্তব্য করা হয় নি।
কড়া প্রতিক্রিয়া দিয়েছে জার্মানি। বলা হয়েছে, "এই হত্যাকাণ্ডে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি ভয়াবহ এক উত্তেজনাকর অবস্থায় উপনীত হয়েছে। এই সংঘাত শুধুমাত্র কূটনৈতিক উপায়েই সমাধান করা যেতে পারে।" তবে ইরান এরই মধ্যে তেলবাহী ট্যাংকার ও সৌদি আরবের তেল স্থাপনায় যে হামলা করেছে, সেদিকে ইঙ্গিত করে জার্মান সরকারের মুখপাত্র উলরিক ডেমার মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেছেন, "ওইসব ঘটনার মধ্য দিয়ে সামরিক উস্কানি দিয়েছিল ইরান। তারই জবাবে যুক্তরাষ্ট্র এমন হামলা চালিয়েছে।"
ইউরোপিয়ান কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট চার্লস মিশেল যেকোনো মূল্যে সব পক্ষকে উত্তেজনা এড়িয়ে চলার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, "ইরাকে সহিংসতা থেকে পুরো অঞ্চলে তা ছড়িয়ে পড়তে পারে।"
যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্র বাহিনী দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে টার্গেট করলেও সাম্প্রতিক সময়ে সাতান্ন ইসলামী দেশের সামরিক বাহিনীর একত্রিতভূতকরন ফর্মুলা নিয়ে কাজ করতে শুরু করাই তাঁর এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা দ্রুত বাস্তবায়ন করা হয়।
গত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে সোলাইমানির ওপর নজরদারি চালাচ্ছিল পশ্চিমা বাহিনী, ইসরাইল ও আরব সংস্থাগুলো। এর আগেও গুপ্তহত্যা থেকে কয়েকবার বেঁচে যান কাসেমি। কিন্তু শুক্রবার বাগদাদ বিমানবন্দরে কাতারে অবস্থিত আমেরিকার সর্বশেষ সামরিক ঘাঁটি থেকে পরিচালিত যুক্তরাষ্ট্রের নিখুত ড্রোন টার্গেটে প্রাণ হারাতে হয় তাকে। উল্লেখ্য গতমাসের তের তারিখ ইরানী সামরিক বিশেষজ্ঞ প্রতিনিধি দলের প্রধান হিসেবে কাতারে সাতান্ন জাতি ভবিষ্যত কর্মপন্হা নির্ধারণী বৈঠকে উপস্থিত হয়েছিলেন জেনারেল সোলাইমানি, যেটি ছিল আমার সাথে তাঁর দ্বিতীয় ও সর্বশেষ স্বাক্ষাত। এর আগে বিগত রমজানে মালয়েশিয়াতে পুত্রজায়া মসজিদে ফিলিস্তিন প্রধানমন্ত্রী, হামাস প্রধান, জেনারেল সোলাইমানির সাথে প্রায় দেড় ঘন্টা সময় অতিবাহিত করার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার।
৯/১১ হামলার পর অস্ত্র হিসেবে ড্রোন ব্যবহার করে আসছে যুক্তরাষ্ট্র। আর প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সময় সেটা আরও সম্প্রসারিত হয়েছে। ট্রাম্প যেটাকে বাড়িয়ে নতুন মাত্রা দিয়েছেন।
মার্কিন বিচার মন্ত্রণালয়েরখ ফাঁস হওয়া আইনি নথি থেকে দেখা গেছে, উপস্থিতি অনেকটা নিশ্চিত হওয়ার পরেই হোয়াইট হাউস কাউকে ড্রোন হামলা চালিয়ে হত্যার নির্দেশ দিতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ‘নিরব ঘাতক’ খ্যাত ড্রোন এমকিউ-৯ রিপার দুটি গাড়ি বহরকে টার্গেট করে হামলা চালায়। এতে কাসেমিসহ এক ইরাকি কমান্ডার আবু মাহদী আল মুহান্দিস এবং তাদের কয়েকজন সহকর্মী। বিমানবন্দরে সোলাইমানিকে অভিনন্দন জানাতে আসেন মুহান্দিস। পরে একই গাড়িতে ওঠেন তারা। আরেকটি গাড়ি ওঠেন তাদের দেহরক্ষীরা। যখনই তাদের গাড়ি বিমানবন্দরের কার্গো এলাকার গেটের সামনে অতিক্রম করে তখনই চারটি মিসাইল একযোগে আঘাত হানে। কার্গোভিলেজের গেটের সিসিটিভি ফুটেজে ভয়াবহ বিস্ফোরণের চিত্র দেখা গেছে। জেনারেল সোলাইমানির (৬২) এবং মুহান্দিসের (৬৬) গাড়িতে দুটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। আর অপর গাড়িতে দুটি ক্ষেপণাস্ত্র।
কাতারে অবস্থিত মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড সদর দফতর যেটি আমার অফিস ও বাড়ি থেকে মাত্র পনেরো মিনিটের ড্রাইভে সেখান থেকেই পাঠানো ঘাতক ড্রোন এমকিউ-৯ থেকে এই চারটি ক্ষেপণাস্ত্র একযোগে ছোড়া হয়েছে।
হত্যাকাণ্ডে ব্যাবহৃত ড্রোনটি সম্পর্কে যতটুকু নিশ্চিত হয়েছি তা হলো, একবার জ্বালানি ভরে প্রায় ১ হাজার ৮০০ কিলোমিটার পর্যন্ত হামলা চলতে সক্ষম এই ড্রোন। ‘এমকিউ-৯ রিপার’ নামে ড্রোনটির ঘন্টায় সর্বোচ্চ গতি হচ্ছে ৪৮২ কিলোমিটার। এতে রয়েছে অত্যাধুনিক ইনফ্রারেড ক্যামেরা, যা রাতেও যুদ্ধক্ষেত্রের ছবি পরিষ্কার পাঠিয়ে দেয় সুদূর কাতারের ঘাঁটিতে বসে থাক চালকের অথবা পেন্টাগনের দ্বায়িত্বরত ও নির্দেশনা প্রাপ্ত হয়ে নির্দেশ দাতা জেনারেলদের মনিটরে।
মার্কিন বিমানবাহিনীর এই ড্রোনটির প্রধান অস্ত্র ‘জিবিইউ-১২ প্যাভওয়ে ২’ লেসার গাইডেড বম্ব ও ‘এজিএম-১১৪ হেলফায়ার ২’ ও ‘এআইএম-৯ সাইডউইন্ডার’ মিসাইল। সোলেমানির কনভয়ে ‘হেলফায়ার ২’ মিসাইল দিয়ে হামলা চালিয়েছে ঐ মার্কিন ড্রোনটি এটি আমি পুরোপুরি নিশ্চিত।
গোটা অপারেশনের সর্বশেষ পর্যায় ছিল দুর নিয়ন্ত্রিত ড্রোন হামলা। এর আগে সোলেমানির গতিবিধির উপর কড়া নজর ছিল যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি ও ইসরাইলি গোয়েন্দাদের। এমনকি ইরানি এই কমান্ডারের ফোনালাপও টেপ করছিলেন তারা। প্রয়োজনে নজরদারি ড্রোন উড়িয়ে সোলাইমানির পিছু ধাওয়া করা হত। বিশ্বস্ত গুপ্তচর, তারবার্তা, প্রাথমিক নিরীক্ষণ বিমান এবং অন্যান্য নজরদারি প্রযুক্তির মাধ্যমে সোলেমানির ওপর নজর রাখা হচ্ছিল। মার্কিন বাহিনীর হাতে পাক্কা খবর ছিল, সোলেমানি বাগদাদ বিমানবন্দরে আসছেন খুব ভোরে।
ইরানের বিপ্লবী গার্ডস বাহিনীর বিদেশে সহায়তার ও অভিযানের দায়িত্ব আল-কুদস ফোর্সের। ৬২ বছর বয়সী নিহত সোলাইমানি ছিলেন এই বাহিনীর প্রধান। হামলায় বিপ্লবী গার্ডসের পাঁচ সদস্য ও হাশেদের পাঁচ সেনা কমান্ডো নিহত হয়েছেন। (চলবে)
কাজী শামীম আহসান সোহেল।
Facebook:- Kazi Shamim Ahsan.


No comments