সবার জানা দরকারঃ ইরানের জেনারেল কাসেম সোলাইমানির হত্যাকাণ্ডের পূর্বাপর (পর্ব এক)
![]() |
| ইরানের জেনারেল কাশেম সোলাইমানি হত্যার পূর্বাপর |
"বর্তমানে ইরানের প্রেসিডেন্ট এর চাইতে ক্ষমতাবান যাকে মনে করা হত, তিনিই হচ্ছেন গতকাল শুক্রবার তেসরা জানুয়ারি সকালে বাগদাদ বিমান বন্দরের কার্গো ভিলেজের গেটের কাছে আমেরিকান প্রেসিডেন্টের নির্দেশে ড্রোন হামলা করে হত্যা করা ইরানী জেনারেল কাসেম সোলাইমানি। বেশিরভাগ ইরানী জনগণের ধারনা ছিল তিনিই হবেন পরবর্তী ইরানী প্রেসিডেন্ট।।
জেনে নেই কে এই কাশেম সোলাইমানি?
"একজন সামান্য নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে জীবন শুরু করা দরিদ্র পরিবারের হাড্ডিসার শিশুটিই পরবর্তীতে মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে প্রভাবশালী সামরিক কমান্ডারে পরিণত হন এবং যিনি যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পিত ড্রোন হামলায় খুন হওয়া ইরানের শীর্ষ জেনারেল কাসেম সোলাইমানি।।।"
-ইরানের পশ্চিম সীমান্তে র্যাবোর্ড গ্রামে একটি দরিদ্র কৃষক পরিবারে জন্ম সোলাইমানির। তিনি বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা পাঁচ বছরেই শেষ করেন। এরপর ১০০ ডলারের মতো পারিবারিক কৃষি ঋণ শোধ করতে ১৩ বছর বয়সে তিনি কেরমানে চলে যান চাকুরীর খোঁজে। সেখানে পানি উন্নয়ন বোর্ডে অপ্রাপ্ত বয়স্ক নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে চাকরি নেন তিনি মাত্র তেরো বছর বয়সে। ঐ চাকুরীর পাশাপাশি কৃষি কাজে শ্রমিকের কাজও করেছেন বহুদিন। এছাড়াও অবসর সময়ে বাজারে কুলির কাজ করতেন তিনি এবং সেই সঙ্গে সময় পেলেই ইরানী ধর্মপ্রচারক হুজ্জাত কামিয়াবের ওয়াজ শুনতে পছন্দ করতেন।-
ইরানের শীর্ষ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির অনুগ্রহভাজন হুজ্জাতের বক্তৃতাই সোলাইমানিকে পরবর্তীতে বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে যোগ দিতে দারুণ ভাবে উৎসাহিত করে।
শাহ শাসনের পতনের পর তিনি বিপ্লব গার্ড বাহিনীর একটি ইউনিটে সৈনিক হিসেবে যোগ দেন। ঐ সময়ে নতুন সরকারের বিরুদ্ধে সামরিক অভ্যুত্থান ঠেকাতেই এই বাহিনী গঠন করা হয়েছিল। দুই মাসের একটি সামরিক বাহিনীর ঘাঁটিতে প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে সংক্ষিপ্ত সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।
জীবনের নতুন ভূমিকায় অন্য সব সৈনিকদের সাথে কুর্দিশ বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দমনে তাকে উত্তর পশ্চিমে পাঠানো হয়। পরবর্তী সময়ে ১৯৮০-৮৮ সালের ইরান-ইরাক যুদ্ধে তিনি অংশ নেন।
যুদ্ধে তার অসীম সাহসিকতার ও রণ কৌশল অবলম্বন দারুণ স্বকীয়তা তাকে সৈনিক থেকে দ্রুতই পদোন্নতি পেতে সাহায্য করে। এরপর দ্রুতই পদোন্নতি পেয়ে কুদস ফোর্সের কমান্ডার হন সোলাইমানি। ইরানের সসাধারন জনগনের কাছে তিনি ছিলেন একজন সেলিব্রেটির মতো। ইনস্টাগ্রামে তার কয়েক মিলিয়ন অনুসারি রয়েছে।
যুদ্ধের হিসাব নিকাশ বেশ ঘনিষ্ঠভাবেই জানা ছিল তার। ইরাক-ইরান যুদ্ধের সময় অধিকাংশ বড় সামরিক অভিযানে সম্মুখ যুদ্ধে তিনি জড়িত ছিলেন। অন্যান্য সকল কমান্ডারের মতোই বহু সহ যোদ্ধাকে হারাতে হয়েছে তাকে।
লড়াইয়ে নিহত হওয়া সেনা ও তাদের পরিবারের প্রতি তিনি সবসময় বেশ শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সাথে মনোযোগী ছিলেন। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রের স্বাদ কখনো মেটেনি তার। যেটাকে তিনি মানবজাতির হারানো বেহেস্ত (ম্যানকাইন্ডস লস্ট প্যারাডাইস) বলে আখ্যা দিয়েছিলেন বারংবার।
ইরাক-ইরান যুদ্ধ শেষ হলে ইরানের অভ্যন্তরে মাদক পাচারবিরোধী লড়াইয়ে মনোযোগী হন এই জেনারেল। এতে তার সফলতা ১৯৯০ এর দশকে নতুন পদোন্নতিতে সহায়তা করে তাকে।
এরপর আল-কুদস ফোর্সের প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয় সোলাইমানিকে। জেরুজালেম শহরের নিয়ন্ত্রণ নিতেই এই বাহিনী গঠন করা হয়েছিল বলে জানা যায়।তারই নেতৃত্বে বেশ কিছু দেশে বেশ সুপরিকল্পিত ভাবেই ইরানের প্রভাব বিস্তারে কুদস ফোর্স সক্রিয় ও দৃশ্যমান ভূমিকা পালন করছে বিগত দুই দশক ধরে।
পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে কাজ করলেও নিজ দেশে তার ব্যাপক প্রভাব ছিল। তার সফলতাই তাকে খামেনির নজরে নিয়ে আসে।
ইরানী জনগণ ও বিজ্ঞ জনের মতে ইরানী প্রেসিডেন্টের চেয়েও তিনি ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ। ইরানের সব দল-উপদলের সঙ্গে তিনি নিয়মিত ও কখনও কখনও একান্তে কথা বলতেন। ইরানের শীর্ষ ধর্মীয় নেতার সঙ্গে তার নিয়মিত সরাসরি যোগাযোগ ছিল। আর ইরানের আঞ্চলিক নীতির দায়িত্বে ছিলেন তিনিই।
বিগত দশ বছরে নিরাপত্তা বাহিনীর ছায়ার জগত থেকে প্রকাশ্য অসাধারন জনপ্রিয় ব্যক্তিতে পরিণত হন জেনারেল সোলাইমানি। ইরান, ইরাক, সিরিয়া, ইয়েমেন, জর্ডান, লেবানন সহ আরব বিশ্বের বেশিরভাগ জনগণের কাছে একজন খাঁটি দেশপ্রেমিক ও অত্যন্ত ধার্মিক হিসেবে আখ্যায়িত ছিলেন তিনি। সম্প্রতি যুদ্ধক্ষেত্রে সেনাদের সঙ্গে সেলফির অনুরাগী হয়ে পড়েছিলেন তিনি যার অসংখ্য প্রমান সোস্যাল মিডিয়ার কল্যাণে সারা পৃথিবীর আরব জনগণের কাছে পৌছে গেছে, এতে করে তার আগামী প্রেসিডেন্ট হওয়ার উচ্চাভিলাষ আলোচনায় সকলের সামনে চলে আসে। তবে এমন আকাঙ্ক্ষার কথা হাসি মুখে সবসময়ই অস্বীকার করে আসছিলেন এই জেনারেল তার নিকটজন ও সাংবাদিকের কাছে।
ইরান তথা ইরানের সাথে ঘনিষ্ঠ আরবদের কাছে সোলাইমানি ছিলেন একজন অকুতোভয় বীর যোদ্ধা, আদর্শ দার্শনিক ও পরম ধার্মিক ব্যক্তি। কিন্তু যুদ্ধের মাঠে ছিলেন চরম বাস্তববাদী ও নির্ভীক যোদ্ধা।
সেই জেনারেল সোলাইমানিকেই কঠিন আমেরিকান প্রেসিডেন্ট, পেন্টাগন ও তাঁদের মিত্র সৌদি আরবের দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে চরম পরিণতির মুখোমুখি হতে হল এবং জীবন দিতে হলো। গতকাল শুক্রবার খুব ভোরে মোট দশজন সহ মার্কিন গুপ্তহত্যার পরিচালিত মিশনে নিহত হন ইরানের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ জনপ্রিয় ব্যক্তি মেজর জেনারেল কাসেম সোলাইমানি।
আনুষ্ঠানিকভাবে তিনি বিপ্লবী গার্ডস বাহিনীর কমান্ডার ও আল-কুদস ফোর্সের প্রধান ছিলেন। কিন্তু অনানুষ্ঠানিকভাবে তিনি মধ্যপ্রাচ্যের মিত্র রাজনীতিবিদ ও বিশাল ছায়া মিলিশিয়া বাহিনীরও সর্বোচ্চ নেতা ছিলেন।
ইরাকের বাগদাদ বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে আসার সময় কার্গো ভিলেজের গেটের সামনে তার ওপর ড্রোন হামলা চালায় মার্কিন বিমান বাহিনী। প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন ক্ষমতাচ্যুত ও হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার পর ইরাকের সাধারণ জনগণের কল্যাণে ইরাককে তার মতো করে এত ভালোভাবে কেউ নতুন আকার দিতে পারেনি।
ইরাকে তিনি ইরাকি সরকার গঠন ও নীতি নির্ধারণের মূল কারিগর হিসেবে কাজ করেছেন। মার্কিন বাহিনীকে অত্যন্ত পরিকল্পিত ভাবে দুর্বল করে দিতে কয়েক বছর ধরে হামলার অভিযোগও করা হচ্ছে তার বিরুদ্ধে। প্রায় এক দশক আগে ইরাকে সদ্য নিযুক্ত মার্কিন কমান্ডারকে একটি বার্তা পাঠিয়ে বলেছিলেন, "প্রিয় জেনারেল (ড্যাভিড) পেট্রাউস, আপনার জানা উচিত যে ইরাক, লেবানন, গাজা ও আফগানিস্তান সংশ্লিষ্ট ইরানের নীতি আমি নিয়ন্ত্রণ করি।"
তখন কাতার, সিরিয়া ও ইয়েমেন এই তালিকায় ছিল না। কিন্তু কয়েক বছর পরে সিরিয়াতে গৃহযুদ্ধ শুরু হলে, ইয়েমেন এ সৌদি আরব কতৃক হামলা হলে এবং সৌদি ও ইউএই কতৃক কাতারে হামলা ও দখলের চেষ্টা হলে একজন গোয়েন্দা প্রধানের ছায়া থেকে বৈশ্বিক আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসেন তিনি। প্রেসিডেন্ট বাসার আল-আসাদকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে, কাতার ও ইয়েমেন এ তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিয়ে সামরিক সহায়তা করে প্রত্যক্ষ অবদান রাখতে সক্ষম হওয়া তাঁকে পর্বত প্রমান জনপ্রিয়তা এনে দিয়েছে। সেই সাথে তার ভূমিকার জন্যই সেরা জেনারেলের মর্যাদা প্রাপ্তিতে অবধান রেখেছে। (চলবে)
কাজী শামীম আহসান সোহেল।
Facebook:- Kazi Shamim Ahsan.


No comments